ভারতে মোদীর তৃতীয় মেয়াদে বাংলাদেশ যা প্রত্যাশা করে

শেখ হাসিনার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়, অনেকটা দু’বোনের সম্পর্কের মতো।

ভারতে মোদীর তৃতীয় মেয়াদে বাংলাদেশ যা প্রত্যাশা করে

এই কারণেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে থাকেন ‘ভারতকে যা দিয়েছি তার বেশি তারা কিছু চাইতে পারে না।’

আবদুল মান্নান

নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে শেষ হল নানা চমকে ভরপুর লোকসভা বা সংসদের নিম্নকক্ষের নির্বাচন। সেই নির্বাচনে অনেক চমক আছে আর আছে নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনা। সেই সব নিয়ে আলোচনা সমালোচনা বিশ্লেষণ ব্যাখা তর্ক বিতর্ক হবে ভারতসহ বিশ্বের দেশে দেশে। টানা তৃতীয়বারের মতো নরেন্দ্র মোদী রবিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর পর ভারতে তিনিই হচ্ছেন দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি টানা তৃতীয়বারের জন্য এই দায়িত্ব পালন করার সৌভাগ্য লাভ করলেন।

ভারতের রাজনীতি খুব জটিল। ভারতে আছে অসংখ্য শক্তিশালী আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল আর আছে শতবর্ষ প্রাচীন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় কংগ্রেস’ যারা আগের সর্ব ভারতীয় আধিপত্য অনেকটা হারিয়েছে। যদিও সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে রাহুল গান্ধীর নেতত্বে কংগ্রেস চোখ ধাঁধানো চমক দেখিয়েছে।

 

ভারতের রাজনীতি এত জটিল হওয়া সত্বেও কখনও কোনও রাজনৈতিক দল হাজারো বৈরি পরিস্থিতিতে দাবি করে না যে সাংবিধানিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। তারা তাদের নিজেদের সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে মেনে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে যা বাংলাদেশের নির্বাচনের রাজনীতিতে অনুপস্থিত। ভারতের নতুন সরকারকে অভিন্দন। অভিন্দন সেই দেশের জনগণকে যারা সফলভাবে তাদের দেশের এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে একটি সফল সমাপ্তির দিকে নিয়ে গেছে।

একই মঞ্চে মমতা, হাসিনা, মোদি

ভারত বা বাংলাদেশে নির্বাচন, নতুন সরকার গঠনের পর্বে সর্বদা সামনে চলে আসে দুই দেশের মধ্যে আগামী দিনের সম্পর্কের বিষয়টি। দিল্লিতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক এটি স্বাভাবিক যে বাংলাদেশের  সঙ্গে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক স্বার্থ সুরক্ষা আর এক দেশ অন্য দেশের সার্বভৌত্বের প্রতি সম্মানের ভিত্তিতে। একটি কারণে ভারতের কাছে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাজায় রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির নিরাপত্তা যা বাংলাদেশে আওয়ামী লিগ সরকার ক্ষমতায় থাকলে নিশ্চিত থাকে। এই কারণেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলে থাকেন ‘ভারতকে যা দিয়েছি তার বেশি তারা কিছু চাইতে পারে না। ’ একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই হতে পারে না। অতীতে এপারে যখনই অন্য কোনও সরকার ক্ষমতায় ছিল তখন বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে অস্ত্র চোরাচালানের মাধ্যমে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলি এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছে। আর এই সব অপকর্মে সহায়তা করেছে রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্র। আওয়ামী লিগ সরকার তা বন্ধ করেছে।  

এটি অনস্বীকার্য যে আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য প্রতিবেশি দেশগুলির মধ্য সুম্পর্ক রক্ষা জরুরি। ইতিমধ্যে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদী তাঁদের সময়ে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বাকি দেশগুলি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মডেল’ হিসাবে বিবেচনা করতে পারে।

মোদী ও হাসিনার সময়ে দিল্লি-ঢাকার সম্পর্ক আরও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এই সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল কারণ লোকসভায় বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লিগের সম্পর্কটা ঐতিহাসিক ও অনেক দৃঢ়। মোদী প্রথমবার সরকার গঠন করার পর ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় কোন বাধা ছাড়া ১৯৪৭ সাল থেকে ঝুলে থাকা ছিটমহল বিনিময় চুক্তিটি পাশ হয়ে যায়। সমাধান হয় দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষমান সীমান্ত চিহ্নিত করণ বিষয়টি। এই একটি ঘটনা প্রমাণ করে ভারতের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশর হিতৈষীর অভাব নেই।

লালকৃষ্ণ আদওয়ানির সঙ্গে শেখ হাসিনা

বাংলাদেশে-ভারতের সম্পর্কের অনত্যম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে উন্নয়ন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা। দুই দেশ আনুমানিক ৪,০৯৭ কিলোমিটারের স্থল সীমানার অংশিদার যা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম। এই বিস্তীর্ণ সীমান্ত দুই দেশের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতাকে অপরিহার্য করে তুলেছে। ভারতের ‘নেইবার ফার্স্ট পলিসি’ ও ‘লুক ইস্ট পলিসি’র মধ্যে নীতির অভিন্নতা আছে যা ২০১৪ সালে প্রথম মোদী সরকারের আমলে ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’র একটি সম্প্রসারিত রূপ। মোদী সরকারের এই নীতির সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ যখন সংযোগ ঘটে তখন দুই দেশের সম্পর্ক নূতন উচ্চতা স্পর্শ করে। যার ফলে এই দুই প্রতিবেশি দেশের মাঝে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক ক্রমান্বয়ে মজবুত হয়েছে।  

বর্তমানে ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের আছে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ। আনুমানিক পাঁচ লক্ষ ভারতীয় বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে বৈধভাবে কর্মরত আছে যার প্রাপ্ত হিসাব মতে প্রতিবছর নিজে দেশে আনুমানিক কয়েক বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠায়। বাংলাদেশ তার সুযোগ সুবিধা সম্প্রসারিত করে বাংলাদেশের সমুদ্র ও নদী বন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভারতেকে ব্যবহার করতে দিয়ে দুই দেশের মাঝে বড় ধরণের সংযোগ ও যোগাযোগের সুবিধা স্থাপনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

অন্যদিকে প্রতি বছর আনুমানিক চব্বিশ লক্ষ বাংলাদেশি ভারতে যায় নানা কাজে। এই সংখ্যার ৫৪ শতাংশ যান শুধু চিকিৎসা নিতে। ফেরার সময় বিভিন্ন ধরনের ভারতীয় পণ্য নিয়ে তারা দেশে ফেরে। পদ্মার অপর পারের মানুষ ইদ বা বিয়ের বাজার করতে যাওয়ার জন্য এখনও বেছে নেয় কলকাতাকে। এর ফলে ভারতের অর্থনীতিতে বাংলাদেশিরা প্রতি বছর  কয়েক মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার জোগান দেয়।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় প্রতেকটি দেশ তাদের প্রতিবেশিদের ওপর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে পরষ্পর পরষ্পরের উপর নির্ভরশীল। যে কারণে এই সব সময় এই দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও অংশীদারিত্বের মনোভাব থাকা অপরিহার্য। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এই মনোভাবের বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কারণ অবিভক্ত ভারতের অংশ হিসেব দুই দেশের অনেক বিষয় এখনও অবিভাজ্য। অর্থনীতি, সামাজিক বন্ধন, ইতিহাস, সংষ্কৃতি ইত্যাদি দুই দেশের বন্ধনকে কখনও ছিন্ন করতে পারেনি।  

তারপরও বেশ কিছু বিষয় আছে যা বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝখানে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। যার অন্যতম তিস্তা সহ দুই দেশের মধ্যে বহমান অভিন্ন নদীর জল বণ্টন সমস্যা। আর অন্যটি সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে ঠুনকো অজুহাতে মানুষ খুন। ভারতের ভিসা প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ বাংলাদেশিদের জন্য অত্যন্ত পীড়াদায়ক।  

রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বা সীমান্ত চিহ্নিত করণ চুক্তির মতো বড় বড় ঝুলে থাকা সমস্যার সমাধান করা যায় তা দুই দেশের রাজনীতিবিদেরা দেখিয়েছেন। একই কথা গঙ্গার জল বণ্টন চুক্তি নিয়েও বলা যায়। এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হবে। আশা করা যায় দুই দেশের স্বার্থে যথা সময়ে এই চুক্তি নবায়ন করা হবে।  

২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশে সফরের সময় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে তা হয়নি কারণ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বেঁকে বসেন। ভারত যেহেতু একটি ফেডারেল কাঠামোর রাষ্ট্র সেহেতু এরকম কোন দ্বিপাক্ষিক আন্তর্জাতিক চুক্তি যখন হয় তখন সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের সম্মতি লাগে। গঙ্গার জল বণ্টন চুক্তির সময় পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে এটাও বাস্তব দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তিস্তার জল বণ্টন সমস্যার সমাধান না হলে বাংলাদেশকে বিকল্প সমাধানের চিন্তা করতে হবে। ইতিমধ্যে তিস্তায় বাংলাদেশ অংশে প্রয়োজনীয় জল সংরক্ষণ ও তার বণ্টন ব্যবস্থায় সহায়তা করার জন্য একটি বহুমুখী ব্যারেজ নির্মাণে চিনের একটি প্রস্তাব বিবেচনায় আছে। ভারত বলতে পারে তেমনটি হলে চিন ভারতের একেবারে পূর্বাংশে এসে যাবে যা তাদের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে। বাংলাদেশকে তো তার নিজের স্বার্থ দেখতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে তিস্তার প্রাপ্য জলের ন্যায্য হিস্যা চেয়েছে।  

চিন ও ভারত বাংলাদেশর দুই গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। তিস্তা মহা প্রকল্পে দুই দেশই সাহায্যের হাত বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এটি একটি চমকপ্রদ ঘটনা। এখন দেখার পরিস্থিতির কোন দিকে গড়ায়।  

তবে এটা দুঃখজনক, ভারতের কোনও কোনও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতা স্রেফ রাজনৈতিক কারণে বাস্তবতা বর্জিত প্রায়শ বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে অসম্মানজনক কথা বলেন। এটি বাংলাদেশের মানুষকে আহত করে। আশা করা যায় আগামীতে এই বিষয়ে এই রাজনীতিবিদরা আরও সচেতন হবেন।  

হোটেলে হাসিনার সঙ্গে রাহুল-প্রিয়াঙ্কা, সোনিয়া

মোদীর শপথ অনুষ্ঠান সেরে দেশে ফেরার আগে শেখ হাসিনা বিজেপি’র বর্ষীয়ান নেতা এলকে আদবানির সঙ্গে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলেন। সোনিয়া গান্ধী তাঁর ছেলেমেয়েদের নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। দুই পরিবারের মধ্য বন্ধন অনেকটা ঐতিহাসিক। মোদীর শপথ অনুষ্ঠানে বেশ কজন রাষ্ট্রীয় অতিথি থাকলেও শেখ হাসিনা ছিলেন বলতে গেলে মধ্যমণি। আগামীতে শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় সফরে দিল্লি যাওয়ার কথা আছে। মোদী সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনাই হয়তো হতে পারেন রাষ্ট্রীয় সফরে দিল্লিতে প্রথম বিদেশি অতিথি। তিনি নিশ্চয়ই বড় কোন চাহিদার ফর্দ নিয়ে যাবেন না। তবে অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিশ্চয়ই আলোচনায় উঠে আসবে আর তার সমাধানও খোঁজার চেষ্টা করা হবে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি শেখ হাসিনার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়, অনেকটা দু’বোনের সম্পর্কের মতো। রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা আগামীতে খালি হাতে ফিরবেন না বলে দুই দেশের সুহৃদরা আশা করে। দুটি প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সমতার ভিত্তিতে স্থাপিত সুসম্পর্ক সকলের জন্যই লাভদায়ক।

লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান. বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।  

news24bd.tv/ab

পাঠকপ্রিয়