বাংলাদেশ ও ভারতের পথচলায় বিশেষ মাত্রা

জয়ন্ত ঘোষাল

বাংলাদেশ ও ভারতের পথচলায় বিশেষ মাত্রা

জয়ন্ত ঘোষাল

ভারতের দক্ষিণ এশিয়া নীতির ভরকেন্দ্র হলো ঢাকা। অর্থনৈতিক হিসেবে এই অঞ্চলে বাংলাদেশই ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পৌঁছেছে প্রায় দুই হাজার কোটি ডলারে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবার দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে জানিয়ে দিয়েছেন শুধু এই কারণে নয়, আরো নানা কারণে ভারতের কাছে বাংলাদেশ হলো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

দুই দিনের এই সফর তাই শেখ হাসিনার দিক থেকেও এক মস্ত বড় কূটনৈতিক সাফল্য। আবার কয়েক দিনের ব্যবধানে শেখ হাসিনার দ্বিতীয়বার ভারতে আসা এবং এত সবিস্তারে আলোচনা ভারতের জন্যও ষোলো আনার ওপর আঠারো আনা কূটনৈতিক সাফল্য।

২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বরে জি২০ সম্মেলনের জন্য বিশেষ আমন্ত্রিত সদস্য ছিল বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা এসেছিলেন।

তারপর নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয়বারের জন্য শপথ গ্রহণ করলেন। আবার সেই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে বিশেষ আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে ভারতে এসেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবার জুলাই মাসে তাঁর চীন সফরের আগে নয়াদিল্লিতে দুই দিনের জন্য আসা এবং এতগুলো চুক্তিতে সই করা, এতগুলো বৈঠক ও এত রকমের আলোচনা। কোনো সন্দেহ নেই, এক বিশেষ মাত্রা প্রদান করল বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক পথচলায়।

বাংলাদেশ ও ভারতের পথচলায় বিশেষ মাত্রানরেন্দ্র মোদির নতুন সরকারের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে বসতে প্রতিনিধিদল নিয়ে শেখ হাসিনা এলেন ২১ জুন শুক্রবার। ১০টিরও বেশি চুক্তিপত্রে এই দুই দিনে তিনি সই করলেন। এর মধ্যে অন্তত চারটির মেয়াদ শেষে নবীকরণ হলো। এমনকি তিস্তার জলবণ্টনের সমস্যা নিয়ে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও ঘরোয়াভাবে সবিস্তার আলোচনা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তিস্তার দুই পারের জলাধার নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশের জল বা পানি সংকটের সমাধানের রাস্তা বের করার প্রচেষ্টা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্যভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

যদি বাণিজ্যের কথাই বলি, তবে এই সুবৃহৎ বাণিজ্যিক সম্পর্কের সঙ্গে পরিকাঠামোগত প্রকল্পগুলোও সাজুয্যপূর্ণ বলে দাবি করেছে সাউথ ব্লক। ভারতের দেওয়া ঋণ প্রকল্প খুব অল্প সুদে বিভিন্ন রেল প্রকল্প ও শক্তিক্ষেত্রে সহযোগিতাকে শক্তিশালী করেছে। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে বয়ে যাওয়া অভিন্ন নদীগুলোর জলবণ্টন, স্থল ও সমুদ্র সীমার বিরোধ নিরসন—এসব ব্যাপারে পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সীমান্ত বিরোধ মিটলেও সীমান্তে হত্যা নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে। তাই এবার সেটা নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করতে ভোলেনি বাংলাদেশ। আবার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও তিস্তা চুক্তিরও তো জট খোলেনি। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সেই তিস্তা চুক্তির জট খোলা যায় কি না, সেটা নিয়ে আবার নতুন করে আলোচনা হয়েছে। অন্তত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিক থেকে এই সমস্যার জট ছাড়ানোর একটা আশ্বাস এবার শেখ হাসিনাকে দেওয়া হয়েছে। আশা করা যায়, দিল্লি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গেও তিস্তা নিয়ে আলোচনা করবে। এর মধ্যে তিস্তার পাশাপাশি পরবর্তী অন্তত তিন বছর যে নদীটাকে ঘিরে আলোচনা কেন্দ্রীভূত হয়, সেটা হলো গঙ্গা। গঙ্গা চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়েও বাংলাদেশের অনেক অভিযোগ আছে। সেগুলো নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কেননা ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গা চুক্তি কার্যকর শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালে।

মনে রাখতে হবে, তিস্তাপারের বৃত্তান্তে চীন খুব সক্রিয়। চীন বাংলাদেশ সরকারকে এরই মধ্যে জানিয়েছে, তারা এক ট্রিলিয়ন ডলার সাহায্য দিতে প্রস্তুত এই তিস্তার সীমান্তে জলাধার নির্মাণ প্রকল্পের জন্য। কিন্তু চীনে যাওয়ার আগে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনা সেটা নিয়েও আলোচনা করেছেন। বাংলাদেশেও যেমন অনেকে মনে করে, চীনের চেয়ে ভারতের কাছে গিয়েই সাহায্য নেওয়াটা বেশি বাস্তবসম্মত। কেননা চীনের কাছ থেকে আর্থিক ঋণ নিয়ে শ্রীলঙ্কা কেমন বিপদে পড়েছিল, সেটাও বাংলাদেশ জানে এবং বাংলাদেশ এই ফাঁদে আজ পর্যন্ত পা দেয়নি। সে কারণে ভারতও কিন্তু এবার শেখ হাসিনাকে আশ্বাস দিয়েছে যে এই তিস্তার তীরে জলাধার নির্মাণ করে পানিসংকট সমাধানের চেষ্টায় ভারত সক্রিয় হবে এবং এভাবে ভারত বাংলাদেশকে আর্থিক সহায়তা দিতে পারে।

শেখ হাসিনার প্রতিনিধিদলটা এবার ভারতের কূটনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়েছে। কেননা রাজনৈতিক প্রতিনিধিদলের পাশাপাশি এবার বাংলাদেশের আর্থিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মহম্মদ শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকি এসেছিলেন। এসেছিলেন বাংলাদেশের বড় ব্যাংকার কাজী জাফরুল্লাহ। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তিত্ব এসেছিলেন, যাঁরা ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে সব সময় সাহায্য করছেন। সদ্য ঈদের ছুটি শেষ হয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম, বিশেষ করে শাক-সবজি, মাছ-মাংসের দাম বেড়েছে এবং সংকট সৃষ্টি করছে। ঢাকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এখনো বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই পটভূমিতে শেখ হাসিনার এবারের সফরটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণ দুই দিকের আলোচনায় এবার কিন্তু খাদ্য, পণ্যসামগ্রী ভারত থেকে রপ্তানির বিষয়টা নিয়েও আলোচনা হয়েছে, যেখানে পেঁয়াজ এবং গম, যে দুটি বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা ছিল, সে দুটি কাটানোর বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

শেখ হাসিনার সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বৈঠক করেছেন। এই বৈঠকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণ এই বৈঠকটিই প্রতিনিধি স্তরের বৈঠক এবং তারপর প্রধানমন্ত্রী স্তরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের অভিমুখ তৈরি করে দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু, উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকর, তাঁদের সঙ্গেও সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ তিস্তাপারে জলাধারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন, যাকে বলা হয়েছে ‘ক্রস বর্ডার রিভার তিস্তার সংলগ্ন জলাধার নির্মাণ প্রকল্প’।

এসব আলোচনার পাশাপাশি মিয়ানমারে যে রোহিঙ্গাদের সমস্যা এবং মিয়ানমার যে নানা কারণে অশান্ত হয়ে উঠছে—কেন অশান্ত হয়ে উঠছে, সেগুলো নিয়েও যথেষ্ট খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। হ্যাটট্রিক করার পর নরেন্দ্র মোদি এবার মিয়ানমারের সমস্যার দিকে বেশি করে নজর দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে বিদ্যুৎ বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. হাবিবুর রহমান এবং রেল বিভাগের সচিব ড. মো. হুমায়ুন কবীরের থাকাটাও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা এবারের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনায় পরিকাঠামোগত সংযোগ, আর্থিক বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ এবং বিদ্যুিবষয়ক চুক্তি—এগুলো ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরো মজবুত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

আসলে নিরাপত্তার জন্য, বিশেষত এই উপমহাদেশের যে অশান্ত নিরাপত্তার আবহ এবং চীন ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতি, সেই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের কাছে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশ কখনো কোনো একটি দেশের দিকে ঝুঁকে না গিয়েও ভারতের সঙ্গে তার ঐতিহাসিক সম্পর্ক অমলিন রাখতে সক্ষম হয়েছে। এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রীও হ্যাটট্রিক করে ক্ষমতায় বসেছেন। শেখ হাসিনা জানুয়ারি মাসে ক্ষমতায় এলেও তিনি ভারতের নির্বাচনের জন্য এত দিন অপেক্ষা করছিলেন। কারণ যেকোনো দেশেই নির্বাচনের দামামা বেজে গেলে তখন সে ক্ষেত্রে অন্যান্য কাজে মনোযোগ দেওয়া, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অসুবিধা হয়। আর সে কারণেই এই ভারতের নির্বাচন শেষ হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সিংহাসনে বসেছেন। সঙ্গে সঙ্গে শেখ হাসিনা কিন্তু বাংলাদেশের সার্বভৌম যে স্বার্থ, সেই সব বিষয় উত্থাপন করেছেন। সব দিক থেকে তাই এবার মোদি-হাসিনার কথা বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। শেখ হাসিনার সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একটি বিরাট শক্তি দেবে বলে মন্তব্য করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তিবর্ধন সিংহ এবং তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুস্তাফিজুর রহমান বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে স্বাগত জানানোর জন্য উপস্থিত ছিলেন। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে লাল গালিচা  সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তাঁকে স্বাগত জানাতে পরিবেশন করা হয় লোকনৃত্য। বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সফরকালীন আবাসস্থল হোটেল তাজ প্যালেসে যান।

ভারত সফর শেষ করে ৯ থেকে ১২ জুলাই চীন সফর রয়েছে শেখ হাসিনার। আগামী মাসে চীন যাওয়ার আগে হাসিনার এই ঝটিকা সফরে শনিবার দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক হলো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এই বিষয়টিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে চীন সফরের আগে শেখ হাসিনা দিল্লি এলেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে প্রায় ১৪টি চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের জন্য প্রস্তুতি কিন্তু শুরু হয়েছিল একদম সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই। স্বাক্ষরিত হয়েছে ১০টি। শেখ হাসিনা দিল্লির রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছেন এবং ভিজিটরস বইয়েও স্বাক্ষর করেছেন। শনিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে তিনি ঢাকায় ফিরে যান।

সর্বশেষ এটা জানা গেছে যে সব কিছু ঠিকঠাক চললে এ বছরের শেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বাংলাদেশ সফরে যেতে পারেন শেখ হাসিনার আমন্ত্রণের ভিত্তিতে। এককথায় বলা যেতে পারে যে—সব ভালো তার, শেষ ভালো যার। শেখ হাসিনা ঢাকায় ফিরে গেলেন নানা রকম সাফল্যের একটি স্তবক হাতে করে।

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র
বিশেষ প্রতিনিধি

এই রকম আরও টপিক

সম্পর্কিত খবর